বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থলপথে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পে। একসময় যে টাঙ্গাইল শাড়ি ছিল ভারতের বাজারে নিয়মিত রপ্তানিযোগ্য একটি জনপ্রিয় পণ্য, বর্তমানে সেই রপ্তানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে টাঙ্গাইল অঞ্চলের শত শত তাঁত কারখানা ও হাজারো তাঁতশিল্পী মারাত্মক সংকটে পড়েছেন।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) টাঙ্গাইলে অনুষ্ঠিত “টাঙ্গাইলের তাঁত: ঐতিহ্যের মালিকানা ও শিল্পের সম্ভাবনা” শীর্ষক এক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশে ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের উদ্যোগে আয়োজিত এ সেমিনারে তাঁত শিল্পের বর্তমান চ্যালেঞ্জ, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং নীতিগত করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা উপদেষ্টা ও বাংলাদেশে ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সি. আর. আবরার। বিশেষ অতিথি ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব এবং বাংলাদেশে ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের সেক্রেটারি জেনারেল রেহানা পারভীন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মাসউদ ইমরান।
সেমিনারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা বলেন, ভারত প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে তুলনামূলক কম দামে প্রায় ৭০ লাখ পিস তাঁতের শাড়ি আমদানি করে থাকে। আগে স্থলপথে একটি শাড়ি রপ্তানিতে গড়ে খরচ হতো প্রায় ৩৮ টাকা। কিন্তু সাম্প্রতিক বিধিনিষেধের ফলে সেই খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৮০ টাকায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি রপ্তানি প্রক্রিয়ায় সময়ও আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, “এই পরিস্থিতিতে আমাদের সামনে দুটি পথ খোলা—নতুন আন্তর্জাতিক বাজার অনুসন্ধান অথবা বিকল্প রপ্তানি রুট গড়ে তোলা। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রণোদনা, নীতিগত সহায়তা ও অবকাঠামোগত সুবিধা ছাড়া এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা কঠিন।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভারত ১৯৯৯ সালেই তাঁত শিল্প সুরক্ষায় বিশেষ আইন প্রণয়ন করেছে। বাংলাদেশ ২০১৩ সালে সে পথ অনুসরণ করলেও বর্তমান বাস্তবতায় সেই আইন নতুন করে পর্যালোচনা ও যুগোপযোগী করার সময় এসেছে। একই সঙ্গে দেশের প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে ঐতিহ্যবাহী পণ্যের প্রচারের জন্য ‘শোকেস কর্নার’ স্থাপনের দাবি জানান তিনি।
টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের উদ্যোক্তা মনিরা এমদাদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ৮০ থেকে ১০০ কাউন্টের সুতা দিয়ে মানসম্মত শাড়ি উৎপাদনের বিকল্প নেই। কিন্তু কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে উদ্যোক্তাদের পক্ষে এই মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাঁতশিল্পী রঘুনাথ বসাক বলেন, সরকারিভাবে তাঁত শিল্পের উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরেই পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। দেশীয় বাজার সম্পর্কে তাঁতিদের কিছুটা ধারণা থাকলেও রপ্তানি বাজার, ব্র্যান্ডিং ও আধুনিক বিপণন বিষয়ে তাদের জ্ঞান সীমিত। ভারতের বাজার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বহু তাঁত কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এজন্য তাঁতিদের প্রশিক্ষণ, ডিজাইন উন্নয়ন ও নতুন বাজার সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। একই সঙ্গে টাঙ্গাইল অঞ্চলের নদীর পানি দূষণ ও দুর্গন্ধ তাঁত শিল্পে বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলেও অভিযোগ করেন।
আরেক তাঁতশিল্পী নীল কমল বসাক জানান, সিল্কের কাঁচামাল আমদানিতে বর্তমানে প্রায় ৬৩ শতাংশ শুল্ক দিতে হচ্ছে। উচ্চমূল্যে কাঁচামাল কিনে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় অনেক তাঁতশিল্পী পেশা পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকছেন। তিনি কাঁচামাল আমদানিতে কর ছাড় দেওয়ার দাবি জানান।
সেমিনারে অংশ নেওয়া তাঁতিরা অভিযোগ করেন, গত কয়েক বছরে কাঁচামালের দাম সাত থেকে আট গুণ বেড়েছে, অথচ শাড়ির বাজারমূল্য প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে শ্রমিকদের নিয়মিত মজুরি প্রদান করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, সরকার একসময় কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অপব্যবহারের কারণে সেই সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়। বর্তমানে তাঁতিরা চার শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন বলেও তিনি জানান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. সি. আর. আবরার বলেন, দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও হস্তশিল্প সংরক্ষণে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, “আমাদের এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ঐতিহ্য নিজস্ব গতিতে বিকশিত হতে পারে।”
মূল প্রবন্ধে অধ্যাপক মাসউদ ইমরান বলেন, বাংলাদেশের অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ) সংরক্ষণে খণ্ডিত প্রকল্প নয়, বরং একটি সমন্বিত জাতীয় আইনি সংস্কার অপরিহার্য। তিনি স্বতন্ত্র আইসিএইচ অ্যাক্ট প্রণয়ন, ‘লিভিং হিউম্যান ট্রেজার’ ব্যবস্থা চালু, জাতীয় ইনভেন্টরি ডিজিটালকরণ এবং শিক্ষা কারিকুলামে ঐতিহ্য অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করেন।
এ ছাড়া মেধাস্বত্ব আইন, নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। টাঙ্গাইল তাঁত শিল্প রক্ষায় জিআই ও ট্রেডমার্ক সংযোগ, সুতা ভর্তুকি, সহজ শর্তে ঋণ, ক্রাফট ট্যুরিজম এবং একটি ডিজাইন ব্যাংক প্রতিষ্ঠাকে সময়ের দাবি বলে উল্লেখ করেন।
সেমিনারে টাঙ্গাইল তাঁতের ঐতিহ্যের মালিকানা, ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই), ব্র্যান্ডিং, বাজার সম্প্রসারণ, বিদ্যমান সংকট ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, গবেষক, তাঁতশিল্পী, উদ্যোক্তা, ডিজাইনার, ফ্যাশন ও টেক্সটাইল খাতের প্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের সদস্যরা অংশ নেন।


