মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানিতে খরচ বাড়ছে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এমন এক সময়ে যখন রপ্তানি আয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বাড়ানোর প্রয়োজন, ঠিক তখনই দেশের পণ্য রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী অবস্থায় রয়েছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, টানা আট মাস ধরে রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে সদ্য সমাপ্ত মার্চ মাসে এই পতন সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৮ শতাংশের কাছাকাছি। দেশের প্রধান রপ্তানি খাতগুলোর মধ্যে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং পাট ও পাটজাত পণ্য—সবগুলোতেই উল্লেখযোগ্য হারে রপ্তানি কমেছে। এমনকি ছোট ও মাঝারি খাতগুলোর অধিকাংশই এই সংকট থেকে রেহাই পায়নি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মার্চ মাসে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৩৪৮ কোটি মার্কিন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৮.৭ শতাংশ কম। এই বড় ধরনের পতন দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
রপ্তানিকারকদের মতে, মার্চ মাসে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে শিল্পকারখানায় কর্মদিবস কম থাকায় উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে আরোপিত পাল্টা শুল্ক এবং পরবর্তীতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার প্রভাব এখনো কাটেনি। ফলে নতুন অর্ডার আসার হার কমে গেছে, যা সামগ্রিক রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, রপ্তানি খাতের এই দুরবস্থার মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিক হলো রেমিট্যান্স প্রবাহ। মার্চ মাসে প্রবাসী আয় দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩৭৫ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এই আয়ের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে, কারণ বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশ আসে এই অঞ্চল থেকেই।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৩৯ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪.৮৫ শতাংশ কম। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অর্থবছরের শুরুতে জুলাই মাসে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি থাকলেও পরবর্তী মাসগুলোতে ধারাবাহিকভাবে রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তৈরি পোশাক শিল্পে মার্চ মাসে রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। চামড়া খাতে সামান্য পতন হলেও সামগ্রিকভাবে বছরের হিসেবে কিছুটা প্রবৃদ্ধি রয়েছে। প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য ও হোম টেক্সটাইল খাতেও নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। একইভাবে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, সুদের হার কমানো এবং ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ করা জরুরি। একইসঙ্গে রপ্তানিকারকদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান দিতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের চাহিদা কমছে। এতে করে বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের টিকে থাকতে নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজস্ব আদায় বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং স্বল্প ব্যয়ে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা—এসব উদ্যোগ গ্রহণ না করলে সামনের দিনে রপ্তানি খাত আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


