বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্য চুক্তি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন। তিনি বলেছেন, প্রস্তাবিত এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে শুল্ক ও অশুল্ক বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা কমিয়ে আনছে, যার ফলে দুই দেশের মধ্যে পণ্য আমদানি–রপ্তানি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে এবং বাণিজ্য সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর শেরাটন হোটেলে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদার’ শীর্ষক মধ্যাহ্নভোজ সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। এছাড়া অ্যামচেম সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ, এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার হাবিব ভূঁইয়া এবং কোলগেট-পামোলিভের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান মাজহারসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকেরা বক্তব্য রাখেন।
শুল্ক বাধা কমিয়ে বাণিজ্য ভারসাম্যের পথে বাংলাদেশ
মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের বাণিজ্য কাঠামোতে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানোর উদ্যোগ দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করছে। তার মতে, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়বে এবং দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ঘাটতি ধীরে ধীরে ভারসাম্যের দিকে যাবে।
তিনি আরও বলেন, “যে দেশ যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বাড়ায়, অথচ আমদানি কম রাখে, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়। টেকসই অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য পারস্পরিক আমদানি–রপ্তানি বৃদ্ধি অপরিহার্য।”
কৃষি ও জ্বালানি আমদানিতে বড় প্রতিশ্রুতি
ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন জানান, আলোচ্য বাণিজ্য চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা।
এছাড়া আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ১,৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি পণ্য আমদানির পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। বর্তমানে এলপিজি আমদানির ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের গম শুধু মানসম্মতই নয়, বরং এতে প্রোটিনের পরিমাণও বেশি এবং পচনের হার তুলনামূলকভাবে কম, যা খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
জ্বালানি, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে সহযোগিতার সম্ভাবনা
রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ১৮ হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। এ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের শেভরন, এক্সিলারেট এনার্জি ও জিই ভার্নোভা’র মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহী।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান ডিজিটাল অর্থনীতি—যেখানে ১০ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে। স্টারলিংক, গুগল পে, ওরাকল ও মাইক্রোসফটের মতো কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনাও উল্লেখ করেন তিনি।
বিনিয়োগনির্ভর নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোর ইঙ্গিত
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মতে, এই বাণিজ্য চুক্তি শুধু পণ্য আদান-প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি বাংলাদেশকে সহায়তা-নির্ভর কাঠামো থেকে বিনিয়োগ ও বাণিজ্যনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, “এটি একটি বাণিজ্যিক চুক্তি, যেখানে মূল লক্ষ্য হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা গড়ে তোলা।”
ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সংস্কারের ওপর গুরুত্ব
অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়ন এবং নীতিগত সংস্কারের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে নীতিগত স্বচ্ছতা ও সহজীকরণ জরুরি।
ব্যবসায়ী নেতারাও আশা প্রকাশ করেন যে, এই ধরনের উদ্যোগ দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করবে এবং বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য নতুন বাজার উন্মোচন করবে।


