কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একদল কর্মকর্তার বিক্ষোভের মধ্যেই কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এমন সংবেদনশীল সময়ে হঠাৎ এ ধরনের সিদ্ধান্তকে অর্থনীতিবিদরা ‘প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার জন্য অশনিসংকেত’ হিসেবে দেখছেন।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী প্রশাসন আহসান এইচ মনসুরকে চার বছরের জন্য গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের অর্থনীতি ছিল প্রবল চাপে—বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে, টাকার বিনিময় হার অস্থির, আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণহীন এবং ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট প্রকট।
নিয়োগ বাতিল প্রসঙ্গে আহসান এইচ মনসুর গণমাধ্যমকে জানান, সরকারের পক্ষ থেকে তাকে পূর্বে কিছু জানানো হয়নি। টেলিভিশনের সংবাদে নতুন গভর্নর নিয়োগের খবর জেনেই তিনি অফিস ত্যাগ করেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানে এমন প্রক্রিয়াহীন পরিবর্তন বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে কী বার্তা দিচ্ছে—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দায়িত্বকালে মনসুর কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। রিজার্ভ পুনরুদ্ধারে কঠোর নীতিমালা, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া, দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি’ গঠনের প্রস্তাব—এসব পদক্ষেপ ব্যাংকিং খাতে কাঠামোগত সংস্কারের সূচনা করেছিল। যদিও এসব উদ্যোগের পূর্ণ ফলাফল পেতে আরও সময় প্রয়োজন ছিল।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম মাসরুর রিয়াজ এ ঘটনাকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক উদ্বেগের বিষয়’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, নির্বাচিত সরকারের গভর্নর পরিবর্তনের সাংবিধানিক ক্ষমতা থাকলেও সংকটকালে সময় ও প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে ধারাবাহিকতা না থাকলে নীতিগত বার্তা দুর্বল হয়ে পড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. দ্বীন ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “বাংলাদেশ যেন পেছনের দিকে হাঁটছে।” তার মতে, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান একজন শিল্পপতি হওয়ায় স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান যদি এমন খাত থেকেই আসেন, যাকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, তবে নীতিনির্ধারণে নিরপেক্ষতা কতটা বজায় থাকবে—এ প্রশ্ন উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বিষয়টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদায়ী গভর্নরকে সম্মানজনক প্রক্রিয়ায় অব্যাহতি না দেওয়া। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বৈদেশিক অংশীদাররা যখন জবাব চাইবে, তখন কী ব্যাখ্যা দেওয়া হবে—তা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান প্রশ্ন তুলেছেন—সরকার সত্যিই কি ব্যাংকিং খাতের গভীর সংস্কার চায়? তার ভাষ্য, একজন ব্যবসায়ীর অগ্রাধিকার হতে পারে করপোরেট স্বার্থ সংরক্ষণ, কিন্তু গভর্নরের প্রধান দায়িত্ব হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে, নিউইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. বিরূপাক্ষ পাল মনে করেন, আহসান এইচ মনসুর একজন যোগ্য অর্থনীতিবিদ হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন পরিবর্তন অপ্রত্যাশিত নয়। তার মতে, যতদিন না বাংলাদেশ ব্যাংক আদেশ সংশোধনের মাধ্যমে পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা হচ্ছে, ততদিন গভর্নর নিয়োগ রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের ঊর্ধ্বে থাকবে না।
আজকের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মো. মোস্তাকুর রহমানকে নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এ পরিবর্তন নতুন সরকারের অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগের অংশ। তার ভাষায়, “শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক নয়, আরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন আসছে; প্রক্রিয়া চলমান।”
বাংলাদেশের ই-কমার্স ও ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশের প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত স্থিতিশীলতা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনলাইন লেনদেন, ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ে, ফিনটেক বিনিয়োগ—সবকিছুই নির্ভর করে আর্থিক খাতের আস্থার ওপর। ফলে নেতৃত্ব পরিবর্তনের এই অধ্যায় কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ও বিনিয়োগ পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।


