নীরবে কিন্তু ধারাবাহিকভাবে অ্যাপটি এখন প্রায় এক কোটি গ্রাহকের কাছে পৌঁছে গেছে, যা দেশের ডিজিটাল আর্থিক সেবায় এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শুধু ব্যাংকটির নিজস্ব গ্রাহকই নয়, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা রকেট এবং অন্যান্য ব্যাংকের গ্রাহকেরাও এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারছেন। ফলে ‘নেক্সাস পে’ ধীরে ধীরে একটি সর্বজনীন ডিজিটাল লেনদেন মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে।
ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে এই অ্যাপের মাধ্যমে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা। প্রতিনিয়ত বাড়ছে ব্যবহারকারী ও লেনদেনের পরিমাণ—যা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার প্রতিফলন। ব্যবহারকারীদের মধ্যে প্রায় ৮৪ শতাংশ পুরুষ এবং ১৬ শতাংশ নারী, যা ভবিষ্যতে নারী অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর সম্ভাবনার দিকেও ইঙ্গিত করে। মোবাইল, ল্যাপটপ কিংবা ডেস্কটপ—সব মাধ্যম থেকেই সহজে এই সেবা গ্রহণ করা যাচ্ছে, ফলে সময় ও স্থান নির্ভরতা কমে এসেছে।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহতেশামুল হক খান জানান, শুরুতে সীমিত ফিচার নিয়ে যাত্রা করলেও সময়ের সঙ্গে অ্যাপটিতে যুক্ত হয়েছে আধুনিক নানা সুবিধা। বর্তমানে মাসিক লেনদেনের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ‘নেক্সাস পে’–কে এমন একটি প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করা লক্ষ্য, যেখানে গ্রাহকেরা শাখায় না গিয়েই অধিকাংশ ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবেন।
আট বছরে কোটি ব্যবহারকারী
২০১৮ সালে ‘নেক্সাস পে’ চালুর মাধ্যমে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে নতুন অধ্যায় শুরু করে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। তবে এর আগেই এটিএম নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ‘রকেট’ চালুর মাধ্যমে ব্যাংকটি প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। অ্যাপটি চালুর পর ধীরে ধীরে এতে নতুন ফিচার যুক্ত হওয়ায় ব্যবহারকারীর সংখ্যাও দ্রুত বাড়তে থাকে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে অ্যাপটির ব্যবহারকারী ছিল প্রায় ৬২ লাখ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০ লাখের বেশি। আর ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক শেষে ব্যবহারকারীর সংখ্যা পৌঁছেছে প্রায় ৯৪ লাখ ৫০ হাজারে। এই প্রবৃদ্ধি দেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতের দ্রুত বিস্তারের একটি বড় উদাহরণ।
লেনদেনে নজির
লেনদেনের দিক থেকেও ‘নেক্সাস পে’ নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। ২০২৩ সালে যেখানে মোট লেনদেন ছিল ৫৮ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি, সেখানে ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালে এই পরিমাণ পৌঁছায় ২ লাখ ৩৭ হাজার কোটিতে। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে প্রায় চারগুণ প্রবৃদ্ধি ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার দ্রুত গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ।
২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই অ্যাপটির মাধ্যমে ৬২ হাজার কোটির বেশি লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে একই ব্যাংকের হিসাবের মধ্যে অর্থ স্থানান্তরে। পাশাপাশি আন্তঃব্যাংক লেনদেন, বিল পরিশোধ, কিউআর কোডের মাধ্যমে কেনাকাটা এবং মোবাইল রিচার্জেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
বর্তমানে দেশজুড়ে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার দোকানে কিউআর কোডের মাধ্যমে ‘নেক্সাস পে’ ব্যবহার করা যাচ্ছে। লেনদেন সংখ্যার দিক থেকেও অ্যাপটি দ্রুত এগোচ্ছে—২০২৩ সালে যেখানে ৪ কোটি লেনদেন হয়েছিল, ২০২৫ সালে তা দ্বিগুণ হয়ে ৮ কোটিতে পৌঁছেছে।
সহজ ব্যবহারের সুবিধা
‘নেক্সাস পে’ ব্যবহার শুরু করা বেশ সহজ। গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপল অ্যাপ স্টোর থেকে অ্যাপটি ডাউনলোড করে মোবাইল নম্বর যাচাই ও একটি সিকিউর পিন সেট করলেই প্রাথমিক নিবন্ধন সম্পন্ন হয়। এরপর ব্যবহারকারী নিজের ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড যুক্ত করে সহজেই লেনদেন শুরু করতে পারেন।
অ্যাপটিতে রয়েছে ব্যালান্স চেক, ফান্ড ট্রান্সফার, বিল পরিশোধ, মোবাইল রিচার্জসহ নানা সুবিধা। এছাড়া ভার্চ্যুয়াল লয়্যালটি কার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন অফার ও ক্যাশব্যাক সুবিধাও পাওয়া যায়।
সব মিলিয়ে, ‘নেক্সাস পে’ শুধু একটি ব্যাংকিং অ্যাপ নয়—বরং এটি বাংলাদেশের নগদহীন অর্থনীতির দিকে অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠছে। ডিজিটাল লেনদেনকে আরও সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ করতে এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম ভবিষ্যতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


