আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান ঋণ কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ঈদের পর আইএমএফের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকায় সফরে আসবে। সংস্থাটির এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসনের নেতৃত্বে এই দলটি বাংলাদেশ সফর করবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র অনুযায়ী, আগামী ২৪ বা ২৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আইএমএফ প্রতিনিধিদলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এই বৈঠকে বাংলাদেশের চলমান ঋণ কর্মসূচি, অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং ভবিষ্যতে অর্থ ছাড়ের বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের এই আলোচনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁদের মতে, বাজেট সহায়তা ও বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ঋণ কর্মসূচিটি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সফরের আগে রোববার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন সংস্থাটির আবাসিক প্রতিনিধি ম্যাক্সিম ক্রিশকো। এর আগে ১৩ মার্চ তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, নীতি সংস্কার এবং ঋণ কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ও আইএমএফের মধ্যে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণ কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি। পরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গত বছরের জুনে অতিরিক্ত ৮০ কোটি ডলার যোগ হওয়ায় কর্মসূচিটির মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৫০ কোটি ডলারে। এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ আইএমএফ থেকে প্রায় ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। তবে এখনও প্রায় ১৮৬ কোটি ডলার ছাড় বাকি রয়েছে।
গত ডিসেম্বর মাসে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা পাওয়া যায়নি। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, কিছু অর্থনৈতিক সংস্কার ও নীতিগত শর্ত পূরণে বিলম্ব হওয়ায় ওই কিস্তি স্থগিত থাকে।
অর্থ বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফ প্রতিনিধিদলের এবারের সফরে ঋণ কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং এর বিপরীতে সরকারের গৃহীত সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি—এই দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাবে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর প্রতিনিধি দল অর্থমন্ত্রী, অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও পৃথক বৈঠক করবে।
এর আগে গত বছরের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে আইএমএফের একটি মিশন প্রায় দুই সপ্তাহ ঢাকা সফর করে। সে সময় মিশনটি সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও আলোচনা করে। আইএমএফের গবেষণা বিভাগের ডেভেলপমেন্ট ম্যাক্রোইকোনমিকস বিভাগের প্রধান ক্রিস পাপাজর্জিও ওই মিশনের নেতৃত্ব দেন। সফর শেষে তিনি জানান, পরবর্তী কিস্তির অর্থ ছাড়ের বিষয়ে নবনির্বাচিত সরকারের মতামত নেওয়াই যুক্তিযুক্ত হবে।
এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় রাজস্ব আহরণের হারে বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের নিম্নতম দেশগুলোর একটি। অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে কর প্রদান না করায় রাজস্ব সংগ্রহ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপ্রয়োজনীয় কর ছাড় কমানো, অপ্রয়োজনীয় ভ্যাট সুবিধা বাতিল করা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য ন্যূনতম টার্নওভার কর বৃদ্ধি করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে সরকারের পক্ষে অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অন্যান্য উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
আগামী এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ১৩ থেকে ১৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল অংশ নেবে বলে জানা গেছে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ—এই দুই প্রেক্ষাপটে আইএমএফের সঙ্গে এবারের আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, ঋণ কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় এবং উভয় পক্ষই সম্ভবত এই কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে আগ্রহী হবে।
তিনি আরও বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংক্রান্ত শর্ত পূরণে বাংলাদেশ অগ্রগতি দেখালেও রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষেত্রে এখনো প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। তাই এবারের আলোচনায় ঋণ কর্মসূচির অগ্রগতি, বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


