মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের গড় দাম প্রায় ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন—এই দুই প্রধান কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ কমোডিটি মার্কেট আউটলুক (এপ্রিল ২০২৬) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। এতে এসব দেশের মূল্যস্ফীতি সাম্প্রতিক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর করে দেবে।
জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ার শঙ্কা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরবরাহ ঘাটতি এবং সংঘাতজনিত ঝুঁকির কারণে ২০২৬ সালে জ্বালানির গড় মূল্য প্রায় ২৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বিশেষ করে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি গড়ে ৮৬ ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা বছরের শুরুতে ধারণার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। পরিস্থিতি আরও জটিল হলে এই দাম ৯৫ থেকে ১১৫ ডলার পর্যন্তও উঠতে পারে।
সরবরাহ শৃঙ্খলে ধাক্কা, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়
যুদ্ধের প্রভাব কেবল জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটায় শিল্পখাত ও কৃষিখাতে কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ভোক্তা পর্যায়ে।
বিশেষ করে সারের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা গেছে। মার্চ মাসে ইউরিয়ার দাম এক মাসেই ৫০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম বড় উল্লম্ফন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে রপ্তানি ব্যাহত হওয়াই এর মূল কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বৃদ্ধিও সারের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
খাদ্য ও ধাতু বাজারেও ঊর্ধ্বগতি
খাদ্যপণ্যের বাজারেও চাপ বাড়ছে। জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে পাম তেল ও সয়াবিন তেলের মতো বায়োফুয়েল নির্ভর পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্ফীতিতে ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে সাধারণ ও মূল্যবান ধাতুর দামও বাড়তির দিকে রয়েছে, যা নির্মাণ ও প্রযুক্তি খাতে ব্যয় বাড়াবে।
তবে কৃষিপণ্যের মধ্যে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোকো ও কফির সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির ফলে পানীয় পণ্যের দাম কিছুটা কমেছে, যা সামগ্রিক খাদ্যমূল্যের ওপর চাপ কিছুটা লাঘব করেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চে দেশের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৭১ শতাংশে। এর মধ্যে নতুন করে বৈশ্বিক পণ্যমূল্য বৃদ্ধির চাপ যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও প্রভাব স্পষ্ট। ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অকটেন, পেট্রল ও কেরোসিনের দামও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এর ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সরাসরি পণ্যের দামে প্রতিফলিত হচ্ছে।
ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি একটি চেইন রিঅ্যাকশনের মতো কাজ করে। উৎপাদন খরচ বাড়ে, সরবরাহ ব্যাহত হয়, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়—সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই বেশি মূল্য দিতে হয়।
ই-কমার্স খাতও এর বাইরে নয়। পণ্যের সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও ডেলিভারি খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনলাইন ব্যবসাগুলোর জন্য মূল্য স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে গ্রাহক পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধি অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠছে।
সামনে কী?
বিশ্বব্যাংক বলছে, পুরো পরিস্থিতি অনেকাংশেই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় এবং জ্বালানি বাজার কত দ্রুত স্থিতিশীল হয় তার ওপর। যদি উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বৈশ্বিক পণ্যমূল্য পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অনিশ্চয়তার সময়ে সরকার ও ব্যবসায়ীদের জন্য প্রয়োজন কৌশলগত পরিকল্পনা, সরবরাহ বৈচিত্র্যকরণ এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ। অন্যথায় মূল্যস্ফীতির চাপ আরও গভীর হয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।


