একসময় দারিদ্র্য, বেকারত্ব আর অনিশ্চয়তা ছিল রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ঘনিরামপুর গ্রামের নিত্যদিনের বাস্তবতা। কাজের সন্ধানে পুরুষদের শহরমুখী হওয়া আর নারীদের ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকা—এই চিত্রটাই ছিল পরিচিত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগে আজ ঘনিরামপুর গ্রাম হয়ে উঠেছে রপ্তানিমুখী শিল্পের এক অনন্য উদাহরণ।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস, একটি শতভাগ রপ্তানিমুখী জুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। গ্রামভিত্তিক এই শিল্প উদ্যোগ শুধু কর্মসংস্থানই সৃষ্টি করেনি, বদলে দিয়েছে হাজারো নারীর জীবনধারা ও সামাজিক অবস্থান।
প্রবাস থেকে দেশে বিনিয়োগের সাহসী সিদ্ধান্ত
তারাগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে মহাসড়কের পাশে সাড়ে ৯ একর জমিতে গড়ে ওঠা এই কারখানার উদ্যোক্তা দুই সহোদর—মো. হাসানুজ্জামান ও প্রয়াত মো. সেলিম। নীলফামারীর বাবুপাড়ার বাসিন্দা এই দুই ভাই আশির দশকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং সেখানে আবাসন ব্যবসায় সাফল্য অর্জন করেন। সফল প্রবাসজীবনের মাঝেও দেশের মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকেই দেশে ফিরে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা।
২০০৯ সালে নীলফামারীতে এবং ২০১২ সালে রংপুরের মিঠাপুকুরে হিমাগার স্থাপনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু। এরপর ২০১৭ সালে প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় শিল্পকারখানায় পরিণত হয়।
নারীর কর্মসংস্থানে অগ্রাধিকার
বর্তমানে ব্লিং লেদারের তিনটি ইউনিটে একযোগে চলছে উৎপাদন কার্যক্রম। প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার জোড়া জুতা তৈরি হচ্ছে, যার বড় অংশ রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে। কারখানার প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমিকই গ্রামীণ নারী।
নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে রয়েছে নারী সুপারভাইজার, মাতৃত্বকালীন ছুটি, চিকিৎসা সহায়তা এবং প্রশিক্ষণকালীন ভাতা। স্থানীয় নারীদের আগে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে যুক্ত করা হচ্ছে, ফলে অদক্ষ শ্রমিকরাও ধীরে ধীরে দক্ষতায় উন্নীত হচ্ছেন।
কারখানার শ্রমিক কল্যাণ কর্মকর্তা জেসমিন আরা জানান, কারখানাটি চালু হওয়ার পর আশপাশের এলাকায় বেকারত্ব প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে। বিশেষ করে নারীদের আয় বাড়ায় পরিবার ও সমাজে তাঁদের সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতাও বেড়েছে।
বদলে যাওয়া জীবনের গল্প
কাটিং ইউনিটের শ্রমিক ভানু রানী বলেন, “গ্রামে বসেই এখন নিয়মিত আয় করছি। আগে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো, এখন সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে পারছি।”
প্যাকেজিং ইউনিটে কর্মরত আদুরি রানী আগে ঢাকায় কাজ করতেন। তিনি বলেন, “শহরে আয় করেও কিছু থাকত না। এখন নিজের গ্রামে থেকে কাজ করছি, পরিবারকে সময় দিতে পারছি, বাড়িতে গবাদিপশু পালনও শুরু করেছি।”
ঘনিরামপুর গ্রামের আরেক শ্রমিক লাভলী বেগমের ভাষায়, “এই কারখানা না হলে এখনও ঋণ করে সংসার চালাতে হতো। এখন ঋণমুক্ত জীবন, মাস শেষে সঞ্চয়—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।”
রপ্তানি, সম্প্রসারণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
কারখানা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে অন্তত ৫১০ জন আগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কাজ করতেন। কারখানাটি চালু হওয়ার পর তাঁরা নিজ এলাকায় ফিরে এসে কাজের সুযোগ পেয়েছেন।
ব্লিং লেদার বর্তমানে পোল্যান্ড, জার্মানি, তুরস্ক, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে সিনথেটিক জুতা রপ্তানি করছে। গুণগত মান নিশ্চিত করতে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তাও নেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি রূপালী ব্যাংকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
প্রতিষ্ঠানটির মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. আবদুল্লাহ আল ফারুক সরকার জানান, পরিকল্পিত সম্প্রসারণ সম্পন্ন হলে দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা বাড়বে এবং ভবিষ্যতে প্রায় ৩৪ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যার সিংহভাগই নারী।
স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব
ঘনিরামপুর বেলতলী বাজারের সবজি ব্যবসায়ী আল-আমিন বলেন, “কারখানা চালুর পর থেকে বাজারে ক্রেতা বেড়েছে কয়েক গুণ। মানুষের আয় বাড়ায় আমাদের ব্যবসাও জমে উঠেছে।”
স্থানীয় কুশা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল হক বলেন, “ব্লিং লেদার প্রমাণ করেছে—গ্রামেও আধুনিক শিল্প সম্ভব। এটি শুধু একটি কারখানা নয়, এটি আত্মমর্যাদা আর সম্ভাবনার প্রতীক।”
উদ্যোক্তার কণ্ঠে প্রত্যয়
ব্লিং লেদারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসানুজ্জামান বলেন, “আমার ভাই সবসময় চাইতেন নারীদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে। আমরা কারখানাটিকে আরও বড় করতে চাই। ভবিষ্যতে দৈনিক ৫০ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। রপ্তানির পাশাপাশি দেশের বাজারেও শক্ত অবস্থান গড়ার পরিকল্পনা আছে।”
গ্রামভিত্তিক শিল্পায়ন, নারী কর্মসংস্থান ও রপ্তানিনির্ভর উৎপাদনের এই সাফল্যগাথা প্রমাণ করে—সঠিক বিনিয়োগ ও পরিকল্পনা থাকলে বদলে দেওয়া যায় পুরো একটি জনপদের ভবিষ্যৎ।


