দেশের অর্থনীতিতে আবারও উদ্বেগ বাড়িয়ে এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ঘর অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে, যা আগের মাস মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে আবারও বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয়।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। এর ফলে বাজারে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো নতুন করে আর্থিক চাপে পড়েছে।
গত ছয় মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সময়ের মধ্যে পাঁচ মাসেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করেছে। মার্চ মাসে সামান্য কমে আশার ইঙ্গিত মিললেও এপ্রিলেই তা আবার বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বাজারজুড়ে
গত ১৯ এপ্রিল সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। নতুন দরে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে সবচেয়ে আগে প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে। পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়ার কারণে কৃষিপণ্য, মাছ, মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়ে যায়। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার খরচও বৃদ্ধি পায়, যার চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর।
রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত দুই সপ্তাহে সবজির দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মাছ ও মাংসের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রয়েছে। যদিও চালের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে, তবুও অন্যান্য নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যে সাধারণ মানুষের ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত দুই খাতেই মূল্যবৃদ্ধি
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশে। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি আরও বেশি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি বেশি হওয়ার অর্থ হলো পরিবহন, জ্বালানি, বাসাভাড়া, পোশাক, চিকিৎসা ও অন্যান্য সেবার খরচ বাড়ছে দ্রুতগতিতে। এতে শহর ও গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সমানভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে গ্রাম ও শহর—উভয় এলাকাতেই সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে।
মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে বেশি দামে বাড়ছে পণ্য
বিবিএসের তথ্যে আরও দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির তুলনায় মানুষের আয় বা মজুরি কম হারে বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যখন মূল্যস্ফীতির হার আয় বৃদ্ধির চেয়ে বেশি হয়, তখন সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ফলে একই আয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য কেনা সম্ভব হয়।
এই পরিস্থিতিতে অনেক পরিবারকে সংসারের খরচ সামাল দিতে ধারদেনার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কেউ কেউ খাবার, পোশাক, চিকিৎসা কিংবা যাতায়াতের মতো প্রয়োজনীয় খাতেও ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি অব্যাহত থাকলে তা ভোক্তা চাহিদা কমিয়ে অর্থনীতির সামগ্রিক গতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মূল্যস্ফীতি কমা মানেই পণ্যের দাম কমা নয়
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে মূল্যস্ফীতি কমলে বাজারদরও কমে যায়। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ হলো আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। অর্থাৎ পণ্যের দাম তখনও বাড়তে পারে, তবে আগের চেয়ে ধীরগতিতে।


