মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে বিশ্ব অর্থনীতি ও আর্থিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও বৃহস্পতিবার এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। একই সঙ্গে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের দামে পতন এবং সুদের হারে বৃদ্ধি লক্ষ করা গেছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে—বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে আবার ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে আপাতত কিছুটা স্বস্তির সঞ্চার হয়েছে। এর পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের প্রত্যাশাকে।
এশিয়ার শেয়ারবাজারে ইতিবাচক ধারা
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটে সূচকের উত্থানের প্রভাব পড়েছে এশিয়ার বাজারেও। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ারসূচক কোসপি আগের দিনের বড় পতন কাটিয়ে বৃহস্পতিবার শক্তিশালীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। একপর্যায়ে সূচকটি প্রায় ১০ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে আঞ্চলিক বাজারের শীর্ষ অবস্থানে উঠে আসে।
এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এমএসসিআই (জাপান বাদে) সূচকও প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে জাপানের নিক্কি সূচক প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার আংশিক পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়।
চীনের বাজারেও দিনের শুরুতে কিছুটা উত্থান দেখা যায়। দেশটির ব্লু-চিপ সিএসআই ৩০০ সূচক প্রায় ১ শতাংশ বাড়ে এবং সাংহাই কম্পোজিট সূচক প্রায় ০.৪ শতাংশ পর্যন্ত উন্নতি করে।
ট্রেজারি বন্ডে চাপ
অন্যদিকে মার্কিন সরকারি বন্ডের বাজারে কিছুটা চাপ লক্ষ্য করা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বেড়ে প্রায় ৪ দশমিক ১০ শতাংশে পৌঁছেছে। একইভাবে ৩০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৭৪ শতাংশে।
সাধারণত বন্ডের সুদের হার বাড়লে তার বাজারদর কমে যায়—এটি আন্তর্জাতিক বন্ডবাজারের একটি মৌলিক নিয়ম। ফলে সাম্প্রতিক পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের দিকে কিছুটা ঝোঁকার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চীনের নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা
এই সময়েই চীন নতুন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। ২০২৬ সালের জন্য দেশটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা সংযত।
চীনের এই পরিকল্পনায় শিল্প খাতে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা কমানো, অর্থনীতির ভারসাম্য আনা এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পারিবারিক ভোগব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
বেইজিং ইতোমধ্যে তাদের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, যেখানে উদ্ভাবন, উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানোর কৌশল তুলে ধরা হয়েছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সাম্প্রতিক সময়ে নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাবমেরিন ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার খবর প্রকাশ পেয়েছে। একই সময়ে ন্যাটোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তুরস্কের দিকে ছোড়া একটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানবিরোধী সামরিক পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। ফলে দ্রুত এই সংঘাতের অবসান হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা।
এই সংঘাত ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যবস্থা এবং আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান মুমুর ডিলিং ম্যানেজার প্যাকো চাও এক বিশ্লেষণ নোটে বলেন, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি খুব দ্রুত আবার বাড়তে পারে। ফলে এশিয়ার বাজারে যে সাময়িক উত্থান দেখা যাচ্ছে তা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। তেলের সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাজার সতর্ক অবস্থাতেই থাকবে।
তেল ও সোনার দাম বেড়েছে
জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ছে। মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৬ দশমিক ৯১ ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ বেশি।
একই সময়ে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৩ দশমিক ৯৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে। স্পট মার্কেটে সোনার দামও বেড়ে আউন্সপ্রতি প্রায় ৫ হাজার ১৭৮ ডলারে পৌঁছেছে, যা নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
মুদ্রাবাজার ও ক্রিপ্টোকারেন্সি
মুদ্রাবাজারে ডলার সূচক সাম্প্রতিক উত্থানের পর কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। প্রধান ছয়টি আন্তর্জাতিক মুদ্রার বিপরীতে ডলারের সূচক বর্তমানে প্রায় ৯৮ দশমিক ৮১ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
জাপানি ইয়েনের দাম ডলারের বিপরীতে প্রায় ০.২ শতাংশ বেড়েছে, ফলে প্রতি ডলারের বিপরীতে প্রায় ১৫৬ দশমিক ৭৫ ইয়েন পাওয়া যাচ্ছে।
অন্যদিকে ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে কিছুটা দরপতন দেখা গেছে। বিটকয়েনের দাম প্রায় ০.৭৮ শতাংশ কমে ৭২ হাজার ৭৭৪ ডলারে নেমেছে। একই সময়ে ইথারের দাম প্রায় ০.৯৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ১৩০ ডলারে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে এবং জ্বালানি সরবরাহে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


