আন্তর্জাতিক জ্বালানিবাজারে আবারও অস্থিরতা বেড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে। সপ্তাহের শুরুতে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৩ ডলারে পৌঁছালেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্যের পর তা দ্রুত কমে ৯৬ ডলারে নেমে আসে। তবে সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি—মঙ্গলবার সকাল নাগাদ দাম আবার বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১০৩ ডলারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ওঠানামার মূল কারণ সরবরাহ নিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা, বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি, বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাজারে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি বা উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো আলোচনা হয়নি। অথচ এর আগে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, দুই দেশের মধ্যে “গঠনমূলক” ও “বিস্তারিত” আলোচনা চলছে এবং খুব দ্রুত একটি চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।
এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। ট্রাম্পের মন্তব্যের পরপরই বাজারে সাময়িক স্বস্তি ফিরে এলেও ইরানের অস্বীকৃতি সেই আস্থাকে আবারও নড়বড়ে করে দিয়েছে।
শুধু তেলবাজারই নয়, এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেলেও এশিয়ার বাজারে বড় ধরনের পতন হয়েছে। জাপানের নিক্কেই সূচক প্রায় ৩.৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক ৬.৫ শতাংশ কমে যায়, যা বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের প্রতিফলন।
এদিকে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে বিঘ্ন ঘটায় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে, কারণ তারা এ পথের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
এর আগে ট্রাম্প সতর্ক করেছিলেন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালানো হতে পারে। জবাবে ইরানও পাল্টা আঘাতের হুমকি দেয়, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প সাময়িকভাবে পাঁচ দিনের জন্য ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার পরিকল্পনা স্থগিত রাখার কথা জানিয়েছেন। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করেছেন, চলমান আলোচনার অগ্রগতির ওপর ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে।
অন্যদিকে ইরানের শীর্ষ নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, “ভুয়া তথ্য” ছড়িয়ে বাজারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকায় বৈশ্বিক ব্যবসা ও ভোক্তারা বাড়তি চাপের মুখে পড়বেন। সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং অবকাঠামোগত ঝুঁকি থাকায় দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার সম্ভাবনাও কম।
এদিকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান সতর্ক করে বলেছেন, এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে। ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট কিংবা সাম্প্রতিক ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক বক্তব্য—এই তিনের সমন্বয়ে বৈশ্বিক জ্বালানিবাজার এখন এক অস্থির সময় পার করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানির দাম এবং ভোক্তা ব্যয়ের ওপর।


