মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সংঘাত ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন করে তীব্র হওয়ায় বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি–সংলগ্ন জলসীমায় বাংলাদেশি পতাকাবাহী একাধিক জাহাজ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)-এর একটি জাহাজ সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দর এলাকায় কার্যত আটকে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা ১০৭টি। এর মধ্যে চারটি জাহাজ মধ্যপ্রাচ্যমুখী পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত। সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় প্রণালির ভেতর ও আশপাশের জলসীমায় নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় এসব জাহাজে থাকা বাংলাদেশি নাবিকদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

জেবেল আলীতে সতর্ক অবস্থায় ‘বাংলার জয়যাত্রা’

হরমুজ প্রণালির ভেতরে অবস্থানরত বিএসসির জাহাজটি হলো এমভি বাংলার জয়যাত্রা। জাহাজটিতে ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক রয়েছেন। ভারত থেকে পণ্য পরিবহনের পর এটি পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে এবং কাতার থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়।

সংঘাত শুরুর পর জাহাজটির কাছাকাছি একটি তেল ডিপোতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়। পণ্য খালাস কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। বিএসসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জাহাজের মাস্টারকে নিরাপত্তা জোরদার, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি এবং নাবিকদের মনোবল অটুট রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সার্বক্ষণিক যোগাযোগও বজায় রাখা হচ্ছে।

২০২২ সালে ইউক্রেন–এর অলভিয়া বন্দরে বিএসসির আরেক জাহাজ ‘বাংলার সমৃদ্ধি’ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার স্মৃতি এখনও নৌখাতে তাজা। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ বিশেষ সতর্ক।

আরব সাগরে অপেক্ষমাণ আরও তিন জাহাজ

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ সংস্থা MarineTraffic–এর তথ্যে দেখা যায়, হরমুজ প্রণালিমুখী আরও তিনটি বাংলাদেশি জাহাজ বর্তমানে আরব সাগরে অবস্থান করছে। এর মধ্যে দুটি কেএসআরএম গ্রুপ এবং একটি মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ–এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন।

কেএসআরএমের নির্বাহী পরিচালক জানিয়েছেন, ওমান ও কুয়েতগামী দুটি জাহাজের গতি কমিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। অপরদিকে মেঘনা গ্রুপের সহযোগী মার্কেন্টাইল শিপিং লাইনস শারজাহর খোর ফাক্কান বন্দরে বাঙ্কারিং শেষে পরবর্তী যাত্রা স্থগিত করেছে। জাহাজটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে অবস্থান করছে।

৭৫০ জাহাজের সম্ভাব্য ঝুঁকি

মেরিন বিমা খাতে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান স্কাইটেক জানিয়েছে, বর্তমানে পারস্য উপসাগরে হরমুজ প্রণালির ভেতরে প্রায় ৭৫০টি জাহাজ রয়েছে, যা সম্ভাব্য অবরোধ বা সামরিক উত্তেজনার কারণে আটকে পড়ার ঝুঁকিতে আছে।

এদিকে United Kingdom Maritime Trade Operations (ইউকেএমটিও) সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, প্রণালি এলাকায় একাধিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। আরব উপসাগর, ওমান উপসাগর ও উত্তর আরব সাগরে বাড়তি সামরিক তৎপরতার কারণে নাবিকদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ই-কমার্স ও আমদানি–রপ্তানিতে প্রভাবের আশঙ্কা

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। ফলে এ পথ অচল হলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমদানি ব্যয় ও পরিবহন খরচে। বাংলাদেশি ই-কমার্স খাতের জন্যও এটি উদ্বেগের বিষয়, কারণ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপমুখী পণ্য পরিবহনের একটি বড় অংশ সমুদ্রপথনির্ভর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাহাজ চলাচলে বিলম্ব হলে আমদানিকৃত কাঁচামাল, ভোগ্যপণ্য ও শিল্প উপকরণের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। এতে ডেলিভারি সময় বাড়বে, লজিস্টিক খরচ বৃদ্ধি পাবে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

নাবিক নিরাপত্তাই অগ্রাধিকার

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নাবিকদের জীবন ও নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকা জাহাজগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ী সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।

নৌবাণিজ্য অধিদপ্তর থেকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে—আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিধিমালা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ জলসীমা এড়িয়ে বিকল্প রুট বিবেচনায় রাখতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পষ্ট—ভূরাজনৈতিক সংঘাত কেবল সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর ঢেউ লাগে বৈশ্বিক বাণিজ্যে, সরবরাহ শৃঙ্খলে এবং শেষ পর্যন্ত ই-কমার্স বাজারেও। তাই নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি বিকল্প লজিস্টিক কৌশল প্রস্তুত রাখাই এখন সময়ের দাবি।

Leave A Reply

Exit mobile version