বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩

একসময় ঈদ মানেই ছিল শপিংমল, বিপণিবিতান ও কোরবানির পশুর হাটে উপচে পড়া ভিড়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা এবং প্রচণ্ড গরমের মধ্যে কেনাকাটার ক্লান্তি। তবে ২০২৬ সালের ঈদ বাজারে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। এখন ঘরে বসেই স্মার্টফোন কিংবা ল্যাপটপের মাধ্যমে খুব সহজে ঈদের পোশাক, উপহারসামগ্রী, গৃহস্থালি পণ্য এমনকি কোরবানির পশুও কিনছেন ক্রেতারা। প্রযুক্তিনির্ভর এই পরিবর্তন দেশের ই-কমার্স খাতকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুতগতির ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ব্যবহারের বিস্তার এবং ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে অনলাইন কেনাকাটার প্রতি মানুষের আস্থা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। দেশের প্রায় সব বড় ফ্যাশন ব্র্যান্ড, সুপারশপ, ইলেকট্রনিক্স প্রতিষ্ঠান এবং লাইফস্টাইল কোম্পানি এখন নিজস্ব ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে। পাশাপাশি ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও ঈদ উপলক্ষে জমজমাট ভার্চ্যুয়াল মার্কেট গড়ে তুলেছেন।

শাড়ি, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস, শিশুদের পোশাক, জুতা, কসমেটিকস, গয়না থেকে শুরু করে ঘর সাজানোর সামগ্রী—সবকিছুই এখন কয়েকটি ক্লিকের মাধ্যমে অর্ডার করা যাচ্ছে। ফলে ক্রেতাদের সময় যেমন বাঁচছে, তেমনি কমছে ভোগান্তিও। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত আট মাসে ই-কমার্স খাতে লেনদেনের পরিমাণ ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি ছাড়িয়েছে, যা দেশের ডিজিটাল বাণিজ্য খাতের দ্রুত সম্প্রসারণেরই প্রমাণ।

এবারের ঈদ বাজারে যুক্ত হয়েছে আরও কিছু আধুনিক প্রযুক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ক্রেতার পছন্দ ও আগ্রহ বিশ্লেষণ করে পণ্য সাজিয়ে দেখানো হচ্ছে। এছাড়া ভার্চ্যুয়াল ট্রায়াল রুম, থ্রিডি প্রোডাক্ট ভিউ এবং স্মার্ট রিকমেন্ডেশন সিস্টেমের কারণে অনলাইনে কেনাকাটা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত ও নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছে। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বসে মোবাইল স্ক্রিনেই পণ্যের ডিজাইন, দাম ও মান যাচাই করে সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন।

শুধু পোশাক বা গৃহস্থালি পণ্য নয়, কোরবানির পশু কেনাবেচাতেও এসেছে ডিজিটাল বিপ্লব। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ফেসবুক পেজে গরু, ছাগল ও ভেড়ার ছবি, ভিডিও এবং ওজনসহ বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। ফলে ক্রেতারা ঘরে বসেই পশু নির্বাচন করতে পারছেন এবং নির্ধারিত সময়ে হোম ডেলিভারির সুবিধাও পাচ্ছেন। এতে পশুর হাটে অতিরিক্ত ভিড় কমার পাশাপাশি সময় ও খরচ দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে।

অনলাইন কেনাকাটার এই উত্থানের অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে ক্যাশলেস বা নগদবিহীন লেনদেন ব্যবস্থা। নগদ টাকা বহনের ঝুঁকি, ভাঙতি টাকার ঝামেলা এবং নিরাপত্তা উদ্বেগ এড়াতে ক্রেতারা এখন ডিজিটাল পেমেন্টে ঝুঁকছেন। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস যেমন bKash, Nagad, Rocket এবং Upay-এর পাশাপাশি ব্যাংক কার্ড ও বাংলা কিউআর কোডভিত্তিক পেমেন্ট এখন ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে বাংলা কিউআর ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ফলে দেশের যেকোনো প্রান্তে দ্রুত ও নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেন আরও সহজ হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে দেশের ই-কমার্স খাত আরও বিস্তৃত হবে এবং প্রযুক্তিনির্ভর কেনাকাটাই হয়ে উঠবে সাধারণ মানুষের প্রধান ভরসা। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অনলাইন শপিংয়ের জনপ্রিয়তা যেভাবে বাড়ছে, তাতে আগামী কয়েক বছরে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে ই-কমার্স বড় অবদান রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এবারের ঈদ বাজার সেই পরিবর্তনেরই স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।

Leave A Reply

Exit mobile version