পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এ লক্ষ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল অপারেটর রবি আজিয়াটা পিএলসি-এর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি বিএসইসির মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগ থেকে জারি করা এক বিশেষ আদেশে এই অনুসন্ধানের পরিধি, পদ্ধতি এবং শর্তাবলি নির্ধারণ করা হয়। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোম্পানিটির সাম্প্রতিক আর্থিক কার্যক্রম, তথ্য প্রকাশের স্বচ্ছতা এবং বিদ্যমান আইন-কানুন ও বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হবে।
ব্যয় দেখানোর পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন
বিএসইসির নজরে এসেছে, ২০২০-২১ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে রবির বিরুদ্ধে পরিচালন ব্যয়কে (Operational Expenditure) মূলধনি ব্যয় (Capital Expenditure) হিসেবে দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। এই ধরনের হিসাব উপস্থাপন বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থার ভিন্ন চিত্র তুলে ধরতে পারে। ফলে প্রকৃত আয়-ব্যয়ের অবস্থা আড়াল করা হয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানের অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একই সঙ্গে এই অভিযোগের আর্থিক প্রভাব কতটা, কারা এর মাধ্যমে সুবিধাভোগী হয়েছেন এবং এর ফলে কোম্পানির আর্থিক বিবরণীতে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে—এসব দিকও খতিয়ে দেখা হবে। কোম্পানির শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) এবং অডিট কমিটির ভূমিকা বিশেষভাবে মূল্যায়ন করা হবে।
সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন ও দ্বৈত ভূমিকা
অনুসন্ধানে কোম্পানির চেয়ারম্যান থায়াপারান এস সাংগারাপিল্লাই-এর দ্বৈত ভূমিকার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। জানা গেছে, তিনি ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ইডটকো গ্রুপ-এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
রবি ও ইডটকোর মধ্যে হওয়া বিভিন্ন লেনদেন, ইজারা চুক্তি এবং শেয়ার হস্তান্তর স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে। পাশাপাশি এসব লেনদেনের মাধ্যমে কোম্পানির সম্পদ, আয় বা মুনাফা কোনো অনিয়ম বা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয়েছে কি না—সেটিও তদন্তের আওতায় থাকবে।
করপোরেট সুশাসন নিয়ে উদ্বেগ
বিএসইসির চিঠিতে করপোরেট সুশাসন সংক্রান্ত বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে কোম্পানির দুই স্বতন্ত্র পরিচালক—আখতার সানজিদা কাশেম এবং কামরান বকর—এর পদত্যাগের পেছনে ‘অযাচিত হস্তক্ষেপ’-এর অভিযোগ তদন্তের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে পরিচালিত অভ্যন্তরীণ তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিশন। পূর্বে তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এই তদন্ত কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ছিল, সেটিও যাচাই করা হবে।
তথ্য প্রকাশে অনিয়মের অভিযোগ
রবি আজিয়াটার ২০২১ ও ২০২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা হয়েছে কি না, তাও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন (Related Party Transactions) এবং গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক তথ্য প্রকাশে বিদ্যমান বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না—তা বিশ্লেষণ করা হবে।
এছাড়া সর্বশেষ বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম)-এ শেয়ারহোল্ডারদের করা বিভিন্ন প্রশ্ন, বিশেষ করে আইনি ব্যয় ও ফরেনসিক খরচ সংক্রান্ত প্রশ্নের যথাযথ উত্তর না দেওয়ার অভিযোগও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
প্রয়োজনে তদন্তের পরিধি বাড়বে
বিএসইসি জানিয়েছে, অনুসন্ধান চলাকালে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট আরও যেকোনো বিষয় তদন্তের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কমিশনের এই পদক্ষেপকে পুঁজিবাজারে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই তদন্তের ফলাফল শুধু সংশ্লিষ্ট কোম্পানির জন্য নয়, বরং দেশের সামগ্রিক পুঁজিবাজারের জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।

