বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩

পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না এবং উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা রয়েছে কি না—এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে পৃথক তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর ইউএসটিআর (USTR) এই তদন্ত পরিচালনা করছে।

ঘোষণা অনুযায়ী, জোরপূর্বক শ্রম সংক্রান্ত শুনানি শুরু হবে আগামী ২৮ এপ্রিল এবং উৎপাদন সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন বিষয়ে শুনানি শুরু হবে ৫ মে। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ শুনানিকে সামনে রেখে বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

প্রস্তুতি ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শুনানির আর মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি থাকলেও এখন পর্যন্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কোনো কার্যকর বৈঠক করেনি। এমনকি সংশ্লিষ্ট শিল্পখাতের সংগঠনগুলোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহেও তেমন উদ্যোগ দেখা যায়নি।

এ অবস্থায় শুনানিতে বাংলাদেশ কতটা শক্তভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ী মহল।

এ বিষয়ে বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান জানান, প্রস্তুতি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ঘাটতি নেই। তিনি বলেন, ইউএসটিআরের সঙ্গে ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ হয়েছে এবং চলতি সপ্তাহেই একটি ভার্চুয়াল বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র: বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার

বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বাজার। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বাজারে প্রায় ৮৬৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ১৮ শতাংশ।

সম্প্রতি শুল্কনীতির পরিবর্তন নিয়েও কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশি পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ ও পুনর্নির্ধারণ করেছে, যা রপ্তানি খাতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

অতিরিক্ত উৎপাদন নিয়ে তদন্ত

গত ১১ মার্চ শুরু হওয়া এক তদন্তে বাংলাদেশসহ ১৬টি দেশের উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা রয়েছে কি না, তা যাচাই করছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও সিমেন্ট খাতের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ইউএসটিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো দেশের অতিরিক্ত উৎপাদন যদি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চাপ সৃষ্টি করে বা তাদের শিল্পখাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে তা বাণিজ্যিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।

এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আর এমন পরিস্থিতি মেনে নেবে না যেখানে অন্য দেশের অতিরিক্ত উৎপাদনের চাপ তাদের বাজারে এসে পড়ে। এটি দেশটির শিল্পখাত পুনরুজ্জীবন নীতির অংশ।

জোরপূর্বক শ্রম নিয়ে পৃথক তদন্ত

একই সঙ্গে ১২ মার্চ বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের বিরুদ্ধে আরেকটি তদন্ত শুরু হয়, যেখানে পণ্য উৎপাদনে জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহারের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এই তদন্তে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন, নীতি ও বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে কি না—তা বিশ্লেষণ করা হবে।

শিল্প খাতের প্রতিক্রিয়া

তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নেই এবং জোরপূর্বক শ্রমের কোনো সুযোগও নেই। তিনি তথ্যভিত্তিক একটি শক্তিশালী প্রতিবেদন তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন।

অন্যদিকে, সিমেন্ট খাতের সংগঠন বিসিএমএ-এর সভাপতি মো. আমিরুল হক জানান, সিমেন্ট শিল্প মূলত মৌসুমি হওয়ায় অতিরিক্ত উৎপাদনের সুযোগ নেই এবং বাজারে প্রতিযোগিতাও যথেষ্ট রয়েছে।

দেরিতে হলেও উদ্যোগ

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অবশেষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে মতামত চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ এবং এলএফএমইএবি।

তাদেরকে দুই দিনের মধ্যে মতামত দিতে বলা হয়েছে, যাতে শুনানিতে উপস্থাপনের জন্য একটি সমন্বিত অবস্থানপত্র (Position Paper) তৈরি করা যায়।

নিট পোশাক খাতের সংগঠন বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, কিছুটা দেরিতে হলেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সবার সমন্বয়ে ভালো প্রস্তুতি নিয়ে বাংলাদেশ শুনানিতে অংশ নিতে পারবে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকদের মতে, এই দুটি তদন্ত বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। যথাযথ তথ্য-উপাত্ত ও কৌশলগত প্রস্তুতির মাধ্যমে যদি বাংলাদেশ নিজেদের অবস্থান শক্তভাবে তুলে ধরতে পারে, তাহলে সম্ভাব্য ঝুঁকি অনেকটাই মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

Leave A Reply

Exit mobile version