মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২

মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সম্ভাব্য স্থল হামলার পরিকল্পনা করছে—এমন আশঙ্কার প্রেক্ষিতে তেহরান কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে, যেখানে দাম হঠাৎ করেই ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

সোমবার সকালে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দাঁড়িয়েছে ব্যারেলপ্রতি ১১৬ ডলার ১০ সেন্ট, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ৩.১৪ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দামও বেড়ে ১০২ ডলার ৩০ সেন্টে পৌঁছেছে, যা ২.৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধের আশঙ্কা এবং সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কাই মূলত এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কাজ করছে।

ইরানের সংসদের স্পিকার সম্প্রতি জানিয়েছেন, তাদের সামরিক বাহিনী সম্ভাব্য মার্কিন আগ্রাসনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিস্থিতি শান্ত করতে কূটনৈতিক আলোচনার কথা বলেছেন এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর জন্য নির্ধারিত সময়সীমাও বাড়ানো হয়েছে বলে জানান।

এদিকে, সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। তারা ইসরায়েলের ওপর হামলা চালানোর মাধ্যমে এই যুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর ফলে শুধু হরমুজ প্রণালিই নয়, বরং লোহিত সাগর এবং বাব আল-মানদেব প্রণালিও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই পথগুলো বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় বাজারে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিসর এবং তুরস্ক কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে। দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সাম্প্রতিক বৈঠকে যুদ্ধ বন্ধে ইতিবাচক অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংলাপ এগিয়ে নিতে তারা সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।

বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি, তেল-গ্যাস স্থাপনায় হামলার কারণে প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও বাড়ছে, যা সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে প্রভাব ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইতিমধ্যে প্রতি গ্যালন গ্যাসের গড় মূল্য প্রায় ৩.৯৮ ডলারে পৌঁছেছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে। বিশেষ করে এশিয়ার আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে। কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত অধিকাংশ তেলের গন্তব্য এশিয়া অঞ্চল।

জ্বালানি বিশ্লেষক বব ম্যাকন্যালি জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক মন্দা ছাড়া তেলের দাম কমার সম্ভাবনা খুবই কম। তার মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে গেলে তেলের চাহিদা হ্রাস পায়, আর তখনই কেবল দাম কিছুটা কমতে পারে।

তবে যুদ্ধ শেষ হলেও দ্রুত তেলের দাম কমবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জ্বালানি অবকাঠামো মেরামত করতে সময় লাগবে। উদাহরণ হিসেবে কাতারের রাস লাফান গ্যাসক্ষেত্রের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে, যেখানে সাম্প্রতিক হামলার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।

এদিকে, এই অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও। সোমবার এশিয়ার প্রধান স্টক মার্কেটগুলোতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। জাপানের নিক্কি ২২৫ সূচক প্রায় ৪.৫ শতাংশ কমেছে, আর দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক নেমেছে প্রায় ৪ শতাংশ।

উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা শুরুর আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল প্রায় ৭২ ডলার। এরপর সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ১৮ মার্চ তা বেড়ে ১১৯ ডলার ৫০ সেন্টে পৌঁছায়—যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই তেলের দাম প্রায় ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ই-কমার্স খাতের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং পণ্যের দাম বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে সামনে আরও চ্যালেঞ্জিং সময় অপেক্ষা করছে।

Leave A Reply

Exit mobile version