মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২

দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় পর অবশেষে ভোটের লড়াইয়ে ফিরছে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী সংগঠন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি। একাধিকবার স্থগিতাদেশ, আদালতে পাল্টাপাল্টি রিট, তফসিল জটিলতা এবং দুই ব্যবসায়ী জোটের দ্বন্দ্বের পর শনিবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে চেম্বারের বহুল আলোচিত দ্বিবার্ষিক নির্বাচন। ইতোমধ্যে ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন বোর্ড ও চেম্বার কর্তৃপক্ষ।

তবে ভোটের ঠিক আগের দিন নতুন মোড় নেয় পুরো পরিস্থিতি। নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্যতম প্যানেল ‘সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ’ আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। যদিও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় ব্যালট পেপারে তাদের প্রার্থীদের নাম ও প্রতীক বহাল থাকছে।

ব্যবসায়ী মহলে এবারের নির্বাচনকে ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কারণ সর্বশেষ সরাসরি ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৩ সালে। এরপর গত এক যুগ ধরে অধিকাংশ কমিটি গঠিত হয়েছে সমঝোতা বা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ফলে দীর্ঘদিন পর ভোটের পরিবেশ তৈরি হওয়ায় সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যেও উৎসবমুখর আমেজ দেখা দেয়। তবে সেই উত্তেজনার মধ্যেই আদালতকেন্দ্রিক জটিলতা এবং নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বারবার অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়।

এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে দুটি বড় প্যানেল। একটি হচ্ছে বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি এস এম নুরুল হকের নেতৃত্বাধীন ‘সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ’। অন্যদিকে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক আমিরুল হকের নেতৃত্বে মাঠে রয়েছে ‘ইউনাইটেড বিজনেস ফোরাম’।

চেম্বার সূত্রে জানা গেছে, সাধারণ শ্রেণি থেকে ১২ জন, সহযোগী শ্রেণি থেকে ৬ জন এবং টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ শ্রেণি থেকে ৩ জন করে পরিচালক নির্বাচিত হবেন। পরে নির্বাচিত পরিচালকদের ভোটে সভাপতি ও দুই সহসভাপতি নির্বাচিত করা হবে। ইতোমধ্যে টাউন অ্যাসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ শ্রেণিতে ছয়জন প্রার্থী প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরিচালক হওয়ার পথে রয়েছেন।

চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা অনুযায়ী সাধারণ শ্রেণিতে এবার ৩৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দুই প্যানেলের ২৪ জনের পাশাপাশি রয়েছেন আরও ১৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। সহযোগী শ্রেণিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৬ জন প্রার্থী। এদের মধ্যে দুই প্যানেলের বাইরে রয়েছেন আরও কয়েকজন স্বতন্ত্র ব্যবসায়ী নেতা।

ব্যবসায়ী মহলের অভিযোগ, নির্বাচনকে ঘিরে দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনি টানাপোড়েনে চেম্বারের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ২০ মাস ধরে কার্যত নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে নীতি নির্ধারণ, ব্যবসায়ী স্বার্থ রক্ষা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমেও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

সাধারণ ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘদিন পর ভোটের সুযোগ এলেও অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও আদালতনির্ভর রাজনীতির কারণে ব্যবসায়ী সমাজ হতাশ হয়ে পড়েছে। তাদের মতে, ব্যবসায়ীদের বৃহত্তর স্বার্থে দুই পক্ষেরই সমঝোতায় আসা প্রয়োজন ছিল।

ইউনাইটেড বিজনেস ফোরামের নেতা আমিরুল হক বলেন, আদালতের প্রতিটি নির্দেশনাকে তারা সম্মান করেন এবং আইনগত কাঠামোর মধ্য থেকেই সব কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা চাই ভোটারদের সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচিত হোক। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই চেম্বারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হওয়া উচিত।”

আদালতে দীর্ঘ ৯ মাসের জটিলতা

চট্টগ্রাম চেম্বার নির্বাচনকে ঘিরে আইনি জটিলতার শুরু হয় গত বছরের আগস্টে তফসিল ঘোষণার পর। সে সময় ১ নভেম্বর ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ট্রেড গ্রুপ ও টাউন অ্যাসোসিয়েশন ক্যাটাগরি নিয়ে আপত্তি ওঠে। একপর্যায়ে কয়েকজন ব্যবসায়ী এফবিসিসিআইয়ের সালিসি ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন। পরে বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়।

এরপর একাধিকবার নির্বাচন স্থগিত হয়। জাতীয় নির্বাচন, আদালতের নির্দেশনা এবং তফসিল সংশোধনের কারণে ভোটগ্রহণের তারিখ বারবার পরিবর্তন করা হয়। চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিলেও নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আদালতের শুনানির কারণে তা পিছিয়ে যায়।

চেম্বার সংশ্লিষ্টরা জানান, এফবিসিসিআইয়ের সালিসি ট্রাইব্যুনাল পুরোনো তফসিল বাতিল করে নতুন বিধিমালার আলোকে তফসিল ঘোষণার নির্দেশ দেয়। পরে আইনি মতামতের ভিত্তিতে পুনরায় ২৩ মে ভোটের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ভোটের মাত্র দুই দিন আগে আবারও উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করা হয়। পরে সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার আদালত হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ স্থগিত করলে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ উন্মুক্ত হয়।

এদিকে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদের নেতা এস এম নুরুল হক নির্বাচনকে “প্রহসনের নির্বাচন” আখ্যা দিয়ে তা বর্জনের ঘোষণা দেন। তাঁর অভিযোগ, আদালতের নির্দেশনা ও বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালার যথাযথ অনুসরণ ছাড়াই তড়িঘড়ি করে নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, ঈদুল আজহার আগমুহূর্তে ও হজ মৌসুমে স্বল্প সময়ের নোটিশে নির্বাচন আয়োজন করায় অনেক ব্যবসায়ী ভোট দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন।

তবে নির্বাচন বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোয়ারা বেগম জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশনা, আইনগত মতামত এবং প্রচলিত সব বিধি মেনেই নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যাঁরা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি, তাঁদের নাম ব্যালটে থাকবেই।”

এদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী অঙ্গনে এখন বিরাজ করছে টানটান উত্তেজনা। দীর্ঘদিন পর ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হলেও শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক ও আইনি নাটকীয়তা পুরো প্রক্রিয়াকে আরও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।

Leave A Reply

Exit mobile version