দেশে জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দ্রুতই পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়তে শুরু করেছে। ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম বাড়ার পর বিভিন্ন রুটে ট্রাকভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ই-কমার্স খাতে, যেখানে পণ্যের ডেলিভারি খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নতুন ঘোষণায় প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকা, অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই দিনে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৭২৮ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সরবরাহ চেইনে চাপ, বাড়ছে লজিস্টিক খরচ
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে সবচেয়ে আগে প্রভাব পড়ে পরিবহন খাতে। দেশের প্রধান পণ্য পরিবহন রুটগুলোতে ইতিমধ্যে ভাড়া বাড়ানোর প্রবণতা দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোতে ট্রাকভাড়া আগেই বেড়েছিল, নতুন করে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে তা আরও বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ই-কমার্স খাতের লজিস্টিক ব্যয়ও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর বড় অংশই নির্ভর করে থার্ড-পার্টি কুরিয়ার ও পরিবহন সেবার ওপর। ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়লে ডেলিভারি চার্জ বাড়ানো ছাড়া বিক্রেতাদের সামনে বিকল্প কম থাকে।
পণ্যের দামে দ্বিতীয় ধাক্কার শঙ্কা
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সাধারণত দুই ধাপে বাজারে প্রতিফলিত হয়। প্রথম ধাপে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, দ্বিতীয় ধাপে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়ে পণ্যের দামে প্রভাব ফেলে। কৃষি পণ্য থেকে শুরু করে শিল্পপণ্য—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কৃষিক্ষেত্রে সেচ ও উৎপাদনে ডিজেলচালিত যন্ত্রের ব্যবহার বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। পরবর্তীতে এসব পণ্য যখন বাজারে পৌঁছাবে, তখন বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের কারণে দাম আরও বৃদ্ধি পাবে। ফলে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোতেও পণ্যের মূল্য সমন্বয় করা হতে পারে।
ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
ই-কমার্স খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক বছরে বিভিন্ন কারণে অপারেশনাল খরচ বেড়েছে। এর মধ্যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নতুন করে চাপ তৈরি করবে। ছোট ও মাঝারি অনলাইন উদ্যোক্তারা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, কারণ তাদের লাভের মার্জিন তুলনামূলকভাবে কম।
একাধিক বিক্রেতা জানিয়েছেন, ডেলিভারি চার্জ বাড়ালে ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যেতে পারে, আবার নিজেরা সেই খরচ বহন করলেও ব্যবসায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে খাতটিতে একটি ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভোক্তা পর্যায়ে প্রভাব
পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার ফলে শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব গিয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। ইতোমধ্যে কিছু পাইকারি বাজারে সবজি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ই-কমার্স খাতে এই পরিবর্তনের ফলে “ফ্রি ডেলিভারি” বা কম খরচের ডেলিভারি অফার কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে দ্রুত ডেলিভারি সেবার খরচও বাড়তে পারে।
মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ার আশঙ্কা
দেশে ইতোমধ্যেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। অতীতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর মূল্যস্ফীতির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই ধরনের প্রভাব দেখা যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন নয়, পুরো অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে। তাই সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং বাজারে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি জরুরি।

