মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানির দামে, যা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
তবে এই সংকট শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়—বরং বৈশ্বিক ই-কমার্স, প্রযুক্তি, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতেও এর প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ায় বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে, যার ফলে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ছে।
সরবরাহে ধস, ই-কমার্সে চাপ
সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে শতাধিক কার্গো জাহাজ চলাচল করত। বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে হাতে গোনা কয়েকটিতে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক ই-কমার্স খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, অনলাইনে বিক্রিত অধিকাংশ পণ্য—যেমন স্মার্টফোন, গ্যাজেট, পোশাক, এমনকি দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্য—বহু দেশ ঘুরে ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। পরিবহন ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সার সংকটে খাদ্যঝুঁকি
তেল ও গ্যাসভিত্তিক পেট্রোকেমিক্যাল থেকে উৎপাদিত সার বৈশ্বিক কৃষির অন্যতম প্রধান উপাদান। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সার—যেমন ইউরিয়া, পটাশ, অ্যামোনিয়া ও ফসফেট—হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এই সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে গেছে, যা উত্তর গোলার্ধের বপন মৌসুমে কৃষকদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন সার ব্যবহার কমে গেলে বছরের শেষ দিকে ফসল উৎপাদন কমে যেতে পারে, যা খাদ্যদ্রব্যের দামে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।
গবেষণা অনুযায়ী, প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হলে বৈশ্বিক গমের দাম ৪.২ শতাংশ এবং ফল ও সবজির দাম ৫.২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। কিছু দেশে খাদ্যদামের বৃদ্ধি আরও বেশি হতে পারে, যা নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য বড় সংকট ডেকে আনবে।
প্রযুক্তি খাতে হিলিয়াম সংকট
বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হিলিয়াম সরবরাহ আসে কাতার থেকে, যা হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই গ্যাস সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—যা স্মার্টফোন, কম্পিউটার, সার্ভার ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস তৈরির মূল উপাদান।
বর্তমানে কাতারের প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র রাস লাফান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে বৈশ্বিক চিপ সংকট আরও তীব্র হতে পারে। ফলে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বিক্রি হওয়া প্রযুক্তিপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এছাড়া হিলিয়াম হাসপাতালের এমআরআই মেশিনে ব্যবহৃত হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবার খরচও বাড়তে পারে।
ওষুধ উৎপাদনে চাপ
মিথানল ও ইথিলিনসহ বিভিন্ন পেট্রোকেমিক্যাল উপাদান ওষুধ উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এই কাঁচামালের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী।
বর্তমান সংঘাতে এসব উপাদানের রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের মতো বড় জেনেরিক ওষুধ রপ্তানিকারক দেশগুলোর সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে ওষুধের দাম বাড়াতে পারে।
ব্যাটারি ও শিল্প খাতে প্রভাব
সালফার, যা তেল ও গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণের উপজাত, বিশ্বব্যাপী ব্যাটারি ও ধাতু শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সমুদ্রপথে পরিবাহিত সালফারের প্রায় অর্ধেক যায়।
এই সরবরাহ ব্যাহত হলে লিথিয়াম ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, গৃহস্থালি ইলেকট্রনিক্স ও এমনকি সামরিক সরঞ্জামের উৎপাদন খরচ বেড়ে যেতে পারে। ফলে ই-কমার্সে এসব পণ্যের দামও বৃদ্ধি পাবে।
বৈশ্বিক বাণিজ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে এর প্রভাব শুধু স্বল্পমেয়াদি মূল্যবৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্গঠন, বিকল্প রুট খোঁজা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে।
সার্বিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত প্রমাণ করছে—একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে বিঘ্ন ঘটলেই তা কীভাবে বিশ্বব্যাপী ই-কমার্স থেকে খাদ্য ও স্বাস্থ্য খাত পর্যন্ত বিস্তৃত প্রভাব ফেলতে পারে। এখন বিশ্ব অর্থনীতি তাকিয়ে আছে পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয়, তার ওপর।

