মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার প্রভাবে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন পরিবহন ব্যবসায়ীরা। ফলে নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে শিল্প ও রপ্তানি খাতের পণ্য পরিবহনে খরচ বেড়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ই–কমার্সসহ বিভিন্ন খাতে পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ব্যবসায়ীরা জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল সরবরাহ কমে যাওয়ায় ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চালকদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে একদিকে সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে। এই বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিত্যপণ্য পরিবহনে ব্যয় বৃদ্ধি
দেশের অন্যতম বৃহৎ সবজির পাইকারি বাজার বগুড়ার মহাস্থান হাট থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ ট্রাক সবজি ও আলু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। সাধারণ সময়ের তুলনায় এখন এসব পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
দুই সপ্তাহ আগেও মহাস্থান হাট থেকে চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজার পর্যন্ত ১০–১২ টন সবজি পরিবহনে ট্রাকভাড়া ছিল প্রায় ২৪ থেকে ২৫ হাজার টাকা। সিলেটের বাজারে একই পরিমাণ পণ্য পাঠাতে খরচ হতো প্রায় ৩০ হাজার টাকা। ঢাকার কারওয়ান বাজার বা শ্যামবাজার পর্যন্ত ট্রাকভাড়া ছিল প্রায় ১৬ হাজার টাকা।
বর্তমানে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, এখন মহাস্থান থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ট্রাকভাড়া বেড়ে প্রায় ৩৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। সিলেট পর্যন্ত ভাড়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা এবং ঢাকায় সবজি পাঠাতে গুনতে হচ্ছে প্রায় ২৫ হাজার টাকা।
মহাস্থান হাট কাঁচা ও পাকা মাল আড়ত ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শফিকুল ইসলাম বলেন, তেলের সীমিত সরবরাহের কারণে অনেক ট্রাক চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বাজারে পণ্য সরবরাহেও প্রভাব পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন।
জ্বালানি সরবরাহে সীমাবদ্ধতা
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল সরবরাহ সীমিত করা হয়েছে এবং যানবাহনভেদে তেল নেওয়ার একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে পরিবহন মালিক ও চালকদের অভিযোগ, নির্ধারিত সীমার চেয়েও কম তেল পাচ্ছেন তারা। অনেক জায়গায় ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানকে ২০ লিটারের বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না। ফলে দীর্ঘ দূরত্বে পণ্য পরিবহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে অনেক পরিবহন মালিক তাদের ট্রাক সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছেন। এতে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় ধীরগতি তৈরি হচ্ছে এবং বিভিন্ন খাতে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা বাড়ছে।
নির্মাণ খাতেও প্রভাব
জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু কৃষিপণ্য পরিবহনেই সীমাবদ্ধ নেই; নির্মাণ খাতেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে রড ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বড় ব্র্যান্ডের রডের দাম টনপ্রতি প্রায় ৯০ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৯৪ হাজার টাকায় উঠেছে। এর সঙ্গে পরিবহন খরচ বাড়ায় নির্মাণ প্রকল্পগুলোর ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইস্পাত খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে পণ্য সরবরাহের সময়সূচি ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে ট্রাকচালকদের ফিলিং স্টেশনে অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান, ঢাকার ভেতরেই রড পরিবহনে এখন ট্রাকভাড়া ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি দাবি করছেন পরিবহন মালিকেরা।
রপ্তানি ও ই–কমার্স খাতে উদ্বেগ
দেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পেও এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে। সাধারণত কারখানা থেকে প্রস্তুত পোশাক কাভার্ড ভ্যানে করে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ডিপোতে পাঠানো হয়। কিন্তু তেলের সংকটের কারণে কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া কয়েক দিনের মধ্যেই উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, ঢাকা থেকে কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া আগে যেখানে ছিল প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকায়। একইভাবে চট্টগ্রাম থেকে কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া ১৫–১৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২০–২২ হাজার টাকায় পৌঁছেছে।
ই–কমার্স খাতের উদ্যোক্তাদের মতে, পরিবহন ব্যয় বাড়লে শেষ পর্যন্ত অনলাইন ব্যবসাতেও এর প্রভাব পড়বে। কারণ পণ্য সংগ্রহ, গুদামজাতকরণ এবং ডেলিভারি—সব ক্ষেত্রেই পরিবহন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অর্থনীতিবিদদের মতামত
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় রেশনিং পদ্ধতি একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হলেও এর সুযোগ নিয়ে যদি পরিবহন খাতে অতিরিক্ত ভাড়া বাড়ানো হয়, তাহলে তা মূল্যস্ফীতিকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
তাদের মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে বিশেষ সুবিধা বা অগ্রাধিকারভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যেতে পারে। পাশাপাশি বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, ভবিষ্যতে এমন আকস্মিক সংকট মোকাবিলার জন্য দেশের পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রাখা অত্যন্ত জরুরি। সরকারের অন্তত তিন মাসের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা থাকলে এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা কমে আসবে।

