ঢাকার আগারগাঁওয়ে অবস্থিত রাজস্ব ভবনে অনুষ্ঠিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাক্-বাজেট আলোচনায় প্রযুক্তি খাতকে আরও গতিশীল করতে কম্পিউটার যন্ত্রাংশে শুল্ক কমানোর জোরালো প্রস্তাব উঠে এসেছে। দেশের ডিজিটাল রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করতে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও উদ্যোক্তারা একাধিক সুপারিশ তুলে ধরেন, যা আসন্ন বাজেটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আলোচনায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস) জানায়, বর্তমানে দেশের মাত্র ৯ শতাংশ মানুষ সরাসরি কম্পিউটার ব্যবহার করেন। উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। একটি সাধারণ মানের কম্পিউটার কিনতে যেখানে ৬০-৬৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়, সেখানে আমদানি শুল্ক কমানো হলে এই খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।
বিসিএসের পক্ষ থেকে মনিটর, এসএসডি, ফায়ারওয়ালসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশে বিদ্যমান ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সংগঠনটির নেতারা বলেন, এতে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রসারই ঘটবে না, বরং তরুণদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি-ভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
এছাড়া, পুরোনো বা রিফার্বিশড ল্যাপটপ আমদানির ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন বা কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়, যাতে নিম্নআয়ের শিক্ষার্থীরা কম খরচে প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পায়।
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান আলোচনায় বিভিন্ন প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, অতীতে প্রযুক্তি খাতে বিভিন্ন ছাড় দেওয়া হলেও তার বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর হয়েছে, তা পর্যালোচনা জরুরি। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থাপিত কম্পিউটার ল্যাবের ব্যবহার নিশ্চিত করার দিকেও নজর দিতে হবে।
অন্যদিকে, নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন উইমেন এন্টারপ্রেনিউর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডব্লিউইএবি) নারীদের জন্য কর অবকাশ, সহজ শর্তে ঋণ এবং কাঁচামাল আমদানিতে বিশেষ সুবিধার দাবি জানায়। সংগঠনটির মতে, নারী উদ্যোক্তাদের টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে ন্যূনতম ৩ থেকে ৫ বছরের কর ছাড় ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এনবিআর চেয়ারম্যান এ বিষয়ে বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নির্দিষ্ট ভ্যাট হার নির্ধারণ করা হলে তাদের কর প্রক্রিয়া আরও সহজ হবে এবং ভ্যাট নিবন্ধনের হারও বাড়বে।
প্রাক্-বাজেট আলোচনায় কর ব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও বিস্তৃত আলোচনা হয়। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) পক্ষ থেকে উচ্চ আয়ের করদাতাদের ওপর করহার বাড়ানোর পরিবর্তে করের আওতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়। সংগঠনটির মতে, দেশের বিপুল অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে পারলে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
তারা প্রস্তাব করেন, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য বছরে ন্যূনতম ১০০ থেকে ১,০০০ টাকার প্রতীকী কর চালু করা যেতে পারে, যা কর সংস্কৃতির বিকাশে সহায়ক হবে।
এছাড়া করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানো এবং ন্যূনতম করহার বাতিলের প্রস্তাবও উঠে আসে আলোচনায়।
ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবি জানায়, অপটিক্যাল ফাইবারে বর্তমানে ৬৫ শতাংশ শুল্ক থাকায় গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেট বিস্তার ব্যাহত হচ্ছে। এই শুল্ক কমানো হলে দেশব্যাপী দ্রুতগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে।
অন্যদিকে, টাওয়ার অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ টাওয়ারকো অ্যাসোসিয়েশন ভ্যাট প্রত্যাহার এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতিতে শুল্ক কমানোর দাবি জানায়।
প্রাক্-বাজেট আলোচনায় দেশের বিভিন্ন জেলা চেম্বারও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য কর ছাড়, প্রণোদনা এবং অবকাঠামোগত সহায়তার দাবি তোলে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রযুক্তি খাতে শুল্ক হ্রাস, কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং ডিজিটাল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানো হলে বাংলাদেশে ই-কমার্স ও ডিজিটাল অর্থনীতি আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে। আসন্ন বাজেটে এসব প্রস্তাব কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

