দেশের জ্বালানি সরবরাহে অস্বাভাবিক অস্থিরতার প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে পড়ছে শিল্পখাতজুড়ে। ইস্পাত, ভোক্তা পণ্য, তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের দ্রুত বর্ধনশীল ই-কমার্স খাতেও, যেখানে সময়মতো ডেলিভারি ও লজিস্টিক ব্যবস্থাই ব্যবসার মূল ভিত্তি।
দেশের শীর্ষ ইস্পাত প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম প্রতিদিন তাদের কারখানা ও পরিবহন ব্যবস্থার জন্য প্রায় ৩৫ হাজার লিটার ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ডিপো থেকে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম তেল সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, ফলে উৎপাদন ও পণ্য পরিবহন উভয় ক্ষেত্রেই বিঘ্ন তৈরি হচ্ছে।
শুধু ইস্পাত খাত নয়, দেশের বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর অবস্থাও একই রকম। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের দৈনিক ডিজেল চাহিদার মাত্র ৬০ শতাংশ সংগ্রহ করতে পারছে। ফলে তাদের হাজার হাজার পণ্যবাহী ট্রাক পুরো সক্ষমতায় চলতে পারছে না। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ চেইন দুর্বল হয়ে পড়ছে, যার প্রভাব ই-কমার্স ডেলিভারিতেও পড়ছে—ডেলিভারি সময় বাড়ছে, খরচ বাড়ছে এবং গ্রাহক অসন্তোষও বাড়ছে।
গাজীপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় জেনারেটর চালাতে ডিজেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু পাম্পে তেল না থাকায় অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানিমুখী পণ্য সরবরাহেও ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এনপলি গ্রুপসহ কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে কাঁচামাল সংকট ও জ্বালানি ঘাটতির কারণে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়েছে। তাদের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত তেল সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা ই-কমার্স খাতের লাস্ট-মাইল ডেলিভারিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলবে।
এদিকে তৈরি পোশাক শিল্পেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ঈদের ছুটি শেষে কারখানাগুলো চালু হলেও অনেক প্রতিষ্ঠান পাম্প থেকে প্রয়োজনীয় ডিজেল সংগ্রহ করতে পারছে না। লোডশেডিংয়ের সময় জেনারেটর চালাতে না পারলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শিল্পমালিকদের সংগঠনগুলো ইতোমধ্যে সরকারের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছে।
বর্তমান সংকটের পেছনে মূল কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে দায়ী করা হচ্ছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে জ্বালানি আমদানিতে বিঘ্ন ঘটায় নির্ধারিত জাহাজের অর্ধেকেরও কম দেশে পৌঁছেছে। বিকল্প উৎস খোঁজার চেষ্টা চললেও তা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশেষজ্ঞরা জ্বালানি তেলের রেশনিং ব্যবস্থা পুনরায় চালুর পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা বলছেন, সীমিত জ্বালানিকে সঠিকভাবে বণ্টন করে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পখাত ও জরুরি সেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি, জ্বালানি চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন সংকট মোকাবিলা আরও কার্যকর করা সম্ভব।
সামগ্রিকভাবে, জ্বালানি সংকট এখন শুধু শিল্প উৎপাদনের সমস্যা নয়—এটি দেশের ই-কমার্স, লজিস্টিকস এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করছে। দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

