বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩

জ্বালানি তেলের ঘাটতির কারণে দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের স্বাভাবিক সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দিতে শুরু করেছে। সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, পর্যাপ্ত জ্বালানি না পাওয়ায় পরিবহন কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপেই তৈরি হচ্ছে চাপ।

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো বলছে, জ্বালানি তেলের অভাবে অনেক প্রতিষ্ঠানের পরিবহনযান পুরোপুরি রাস্তায় নামানো সম্ভব হচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ছে সরাসরি বাজারে পণ্য সরবরাহের ওপর। অনেক প্রতিষ্ঠানই চাহিদা অনুযায়ী পণ্য বাজারে পৌঁছে দিতে পারছে না। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকটের কারণে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন কার্যক্রমও ব্যাহত হতে শুরু করেছে।

পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে গত দুই দিনে পণ্যভিত্তিক একাধিক বাণিজ্য সংগঠন সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। তবে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল না পাওয়ায় সামগ্রিকভাবে পণ্য সরবরাহ প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে নদীপথে আসা কাঁচামাল পরিবহনের জন্যও ভাড়ায় ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন প্রক্রিয়ায়ও বিলম্ব হচ্ছে।

বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বাজারে পণ্যের সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।

বৈশ্বিক উত্তেজনার প্রভাব

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতের কারণে তেল ও গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় বাংলাদেশেও অনেক মানুষ আগেভাগে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পেট্রলপাম্পে ভিড় করছেন।

এ অবস্থায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গত রোববার থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ সীমিত করেছে। তার আগেও ৬ মার্চ থেকে ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল বিক্রির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়।

নিত্যপণ্য সরবরাহে চাপ

দেশের বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও এ সংকটের প্রভাব অনুভব করতে শুরু করেছে। একাধিক শিল্প গ্রুপ জানিয়েছে, ডিপো থেকে পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ট্রাক বর্তমানে অলস পড়ে আছে। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহনে ধীরগতি তৈরি হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা জানান, অনেক ক্ষেত্রে ট্রাকগুলোকে দীর্ঘ সময় ধরে ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। তবুও প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

ভোজ্যতেল সরবরাহেও আশঙ্কা

ভোজ্যতেল পরিশোধন ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটের কারণে তাদের নিজস্ব পরিবহনের বড় একটি অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে ভাড়ায় পরিবহনযান পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে তারা মনে করছে।

ওষুধ সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ

জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়তে পারে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহেও। ওষুধ শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, কারখানা থেকে কেন্দ্রীয় গুদাম, সেখান থেকে ডিপো এবং খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে ওষুধ পৌঁছে দিতে পরিবহনব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে জ্বালানি সংগ্রহ করতে অনেক সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

ওষুধ শিল্প সমিতি ইতিমধ্যে জ্বালানিমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়ে ওষুধ পরিবহনকারী যানবাহনকে ফিলিং স্টেশনে অগ্রাধিকার দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।

শিল্প উৎপাদনে বাধা

জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়ছে রপ্তানিমুখী শিল্পেও। তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় উৎপাদন চালু রাখতে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করা হয়। কিন্তু প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ায় অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন জানিয়েছে, ঈদের আগে সাধারণত কারখানাগুলোতে উৎপাদনের চাপ বেশি থাকে। এ সময় জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ও পণ্য রপ্তানিতে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

সমাধানে অগ্রাধিকার প্রয়োজন

অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন, বৈশ্বিক সংকটের কারণে সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে জ্বালানি বণ্টনে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য, ওষুধ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানাকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা এড়ানো সম্ভব হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে জ্বালানি সংকটের প্রভাব দেশের সামগ্রিক সরবরাহব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে আরও গভীরভাবে পড়তে পারে।

Leave A Reply

Exit mobile version