মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২২

রাজধানীতে জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ায় ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক যানবাহনের মালিকরা এখন বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে এলপিজি (অটো গ্যাস) কনভারশনের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। খরচ কমানো, সহজলভ্যতা এবং সময় সাশ্রয়ের কারণে অনেকেই গাড়িকে এলপিজিতে রূপান্তর করছেন। তবে সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি এই আগ্রহে কিছুটা ভাটা ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মোহাম্মদপুরের জনতা হাউজিং এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী শেখ আসিফ তার ১৫০০ সিসির টয়োটা গাড়িটিকে সম্প্রতি এলপিজিতে রূপান্তর করেছেন। স্থানীয় একটি কনভারশন সেন্টারে এ কাজ করতে তার প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তিনি জানান, ব্যবসায়িক কাজে প্রতিদিন বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়, আর জ্বালানি সংগ্রহে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো সময়সাপেক্ষ। পাশাপাশি জ্বালানির মান নিয়েও তার উদ্বেগ রয়েছে। সব মিলিয়ে বিকল্প হিসেবে এলপিজিই তার কাছে যুক্তিসংগত মনে হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার পর থেকেই এলপিজি ও সিএনজি কনভারশনের চাহিদা বেড়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন কনভারশন সেন্টার ঘুরে দেখা গেছে, আগের তুলনায় এখন কর্মব্যস্ততা অনেক বেশি। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে মাসিক কনভারশনের সংখ্যা কয়েকগুণ পর্যন্ত বেড়েছে।

তেজগাঁওয়ের একটি অটোমোবাইল সার্ভিসিং প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চ মাসে কনভারশনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি গাড়িকে এলপিজি বা সিএনজিতে রূপান্তর করতে বর্তমানে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিএনজি ব্যবহারে জ্বালানি খরচ ৭০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব, আর এলপিজিতে তা ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় হয়।

গাড়ি বিশেষজ্ঞদের মতে, এলপিজি সিলিন্ডার তুলনামূলক হালকা এবং কম জায়গা নেয়, যা ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য সুবিধাজনক। মাইলেজের দিক থেকেও এলপিজি বেশ কার্যকর—প্রতি লিটার এলপিজিতে গড়ে ৮-১২ কিলোমিটার পর্যন্ত চলা যায়, যা অনেক ক্ষেত্রে অকটেনের কাছাকাছি পারফরম্যান্স দেয়। উপরন্তু, দীর্ঘদিন ধরেই এলপিজির দাম অকটেনের তুলনায় কম ছিল, যা ব্যবহারকারীদের আগ্রহ বাড়িয়েছে।

তবে এই ইতিবাচক প্রবণতার মাঝেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সম্প্রতি অটো গ্যাসের দাম লিটারে প্রায় ১৮ টাকা বাড়িয়েছে। ফলে প্রতি লিটার এলপিজির দাম এখন প্রায় ৮০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। এই হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি অনেক সম্ভাব্য ব্যবহারকারীর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানীর বিভিন্ন কনভারশন সেন্টারের মালিকরা জানিয়েছেন, মূল্যবৃদ্ধির আগে প্রতিদিন যেখানে একাধিক গাড়ি কনভারশনের জন্য আসত, এখন সেই সংখ্যা কিছুটা কমতে শুরু করেছে। অনেকেই আগ্রহ দেখালেও বাড়তি খরচের কারণে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় পড়ছেন।

এদিকে শুধু গাড়ি নয়, মোটরসাইকেলেও এলপিজি কনভারশনের প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে রাইডশেয়ারিং সেবায় যুক্ত চালকদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর কিছু ওয়ার্কশপে ১৩-১৪ হাজার টাকায় মোটরসাইকেল এলপিজিতে রূপান্তর করা হচ্ছে। প্রতিদিনই কয়েকটি মোটরসাইকেল এই সেবার আওতায় আসছে, যা আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।

তবে মোটরসাইকেলে এলপিজি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও আইনি দিক নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় অনেকেই ঝুঁকি নিয়েই এই কনভারশন করছেন, যা ভবিষ্যতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়াতে পারে।

সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নগরবাসী বিকল্প পথ হিসেবে এলপিজি ও সিএনজির দিকে ঝুঁকলেও, মূল্যবৃদ্ধি ও নীতিগত অনিশ্চয়তা এই খাতের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিরাপদ ও টেকসই ব্যবহারের জন্য দ্রুত নীতিমালা প্রণয়ন এবং বাজার স্থিতিশীল রাখা জরুরি।

Leave A Reply

Exit mobile version