মার্চ মাসে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে এখনো পুরোপুরি স্বস্তি ফিরে আসেনি। চালের দামে নিম্নমুখী প্রবণতা মূল্যস্ফীতিকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনলেও সবজি, মাছ, মাংসসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য ভোক্তাদের ব্যয়চাপ ধরে রেখেছে। ফলে বাজার পরিস্থিতি এখনো অস্থির রয়ে গেছে।
সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)-এর সর্বশেষ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মার্চ মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৭১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯.১৩ শতাংশ। তবে খাদ্য খাতে কিছুটা স্বস্তি এলেও খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যচাপ প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চালের বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই খাতে মূল্যস্ফীতি ঋণাত্মক পর্যায়ে নেমে এসেছে। কিন্তু একই সময়ে সবজি, মাছ ও মাংসের দামে ঊর্ধ্বগতি সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতিকে ভারসাম্যহীন করে তুলেছে। বিশেষ করে সবজির বাজারে সবচেয়ে বেশি চাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, শীতকালীন ফসলের মৌসুম শেষ হয়ে যাওয়ার পরও গ্রীষ্মকালীন সবজি পুরোপুরি বাজারে প্রবেশ না করায় সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে দাম আরও বেড়ে গেছে। ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে সবজি খাত।
ফলের বাজারেও একই প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। মৌসুমি পরিবর্তন, সংরক্ষণ ব্যয় এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে ফলের দাম তুলনামূলক বেশি অবস্থানে রয়েছে। এতে ভোক্তাদের দৈনন্দিন খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, মাংসের বাজারে মূল্যস্ফীতি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মার্চ মাসে এ খাতে মূল্যস্ফীতি ১৫ শতাংশের বেশি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, পশুখাদ্যের দাম বাড়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা—এসব কারণেই এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না, ফলে প্রকৃত আয় কমে গিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য এই চাপ আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।
তবে বৈদেশিক খাতে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। কিন্তু রপ্তানি আয়ে কিছুটা ধীরগতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতি ভবিষ্যতের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
প্রতিবেদন আরও ইঙ্গিত দিয়েছে, রাজস্ব আহরণে ঘাটতি এবং উন্নয়ন ব্যয়ের গতি কমে যাওয়ায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিছুটা শ্লথতা দেখা দিতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে দ্রুত নজর দেওয়া প্রয়োজন।

